গোলটেবিল বৈঠকে ব্যবসায়ীরা

সুপারশপ খাতে টার্নওভার কর তিন-চতুর্থাংশ কমানোর প্রস্তাব

আধুনিক রিটেইল বা সুপারশপগুলোকে অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় বর্তমানে মোট লেনদেনের ওপর ১ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হয়।

এমনকি লোকসান হলেও তাদের এ কর পরিশোধ করতে হয়। ফলে এ খাতের সম্প্রসারণে অর্থায়নগত সমস্যা হয়। তাই টার্নওভারের ওপর করের হার তিন-চতুর্থাংশ কমিয়ে দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের আধুনিক রিটেইল খাতের উন্নয়ন: প্রতিবন্ধকতা, উত্তরণের উপায় এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ দাবি জানানো হয়। এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সুপারমার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসওএ) এ বৈঠকের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (করনীতি) মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। এছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুয়াল্লিম আহমেদ চৌধুরী, ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খান, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সভাপতি মো. কাওসার আলম, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা, এনবিআরের সাবেক সদস্য (করনীতি) অপূর্ব কান্তি দাস এবং অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ। গোলটেবিল বৈঠক শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিএসওএর মহাসচিব জাকির হোসেন।

বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ‘ব্যবসায়ে লাভ না হলেও বিক্রির ওপর যে ন্যূনতম কর নেয়া হচ্ছে তা আয়কর আইনের সঙ্গে কোনোভাবেই যায় না। আমাদের এ মুহূর্তে কর আদায়ের যে পদ্ধতিটি আছে, বিশেষ করে ন্যূনতম করের যে ধারণাটি আছে, আমি নিজেও মনে করি, ইট ডাজন্ট গো উইথ দ্য ফিলোসফি অব প্রগ্রেসিভ ট্যাক্স।’

বৈঠকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ খাতে ন্যূনতম কর ১ শতাংশ থাকায় প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ হচ্ছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ‘আধুনিক আয়কর নীতির সঙ্গে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ একটি আইন তৈরি করাটা এনবিআর বা সরকারের জন্য কখনো খুব আনন্দের বিষয় ছিল না।’ তার মতে, দেশের অনানুষ্ঠানিক খাত বড় হওয়ায় ও সেখান থেকে রাজস্ব আদায় কঠিন হওয়ায় সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

তিনি আরো বলেন, ‘আধুনিক রিটেইল খাতের টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে কমানো যায় কিনা তা নিয়ে আলোচনা করা হবে। তবে এসব বিষয়ে নানামুখী পরামর্শ ও চাপ থাকে।’ সবদিক বিবেচনায় নিয়ে ইতিবাচক নীতি প্রণয়নের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। এতে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের খুচরা বাজারের আকার প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। এ খাতে সরাসরি সাড়ে ১৭ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আধুনিক সুপারশপগুলো কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় কমানো এবং নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বৈঠকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, সুপারমার্কেট খাতের মতো সংগঠিত মুনাফার ব্যবসায় কর-পূর্ব আয়ের প্রান্তিক সীমা ১-৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে এ খাতে পুনর্বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে।

বক্তারা আরো বলেন, ২০২৫ সালে এনবিআর এ খাতের ভ্যাট কাঠামো সংস্কার করায় সুপারমার্কেটগুলোর বিক্রিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু বর্তমান টার্নওভার ট্যাক্স বা ন্যূনতম কর এ অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। করদাতাদের স্বচ্ছতার মাধ্যমে ব্যবসা করা সুপারমার্কেটগুলো সরকারকে নিয়মিত রাজস্ব দিচ্ছে। কিন্তু এ বাড়তি করের বোঝা খাতের আনুষ্ঠানিকীকরণকে নিরুৎসাহিত করছে।

এ সময় ব্যবসায়ীরা এ খাতের জন্য টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম করের হার বর্তমানের ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণের সুস্পষ্ট প্রস্তাব করেন। তারা যুক্তি দেন যে এ হার টেকসই এবং এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কার্যকর হলে ব্যবসায়ীদের হাতে সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ ও নতুন বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকবে।

গোলটেবিল বৈঠকে সরকারের নীতি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, যাতে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভোক্তা নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। দেশের অর্থনীতিকে প্রথাগত ধারা থেকে আধুনিক কাঠামোতে রূপান্তর এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আধুনিক রিটেইল খাতের সম্প্রসারণ একটি সহায়ক রাজস্ব পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বক্তারা।

আরও